Thursday, August 6, 2015

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ইউনিট

অভাব আর তাড়িয়ে বেড়ায় না এলিজাকে
সাজিদা ইসলাম পারুল সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৩
টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার থানার বেতজা গ্রাম। এ গ্রামের এক হত দরিদ্র কৃষক মোঃ শুকুর আলী ও হামিদা দম্পতির মেয়ে এলিজা। অভাবের কারণে এলিজাকে খুব বেশিদূর লেখাপড়া করাতে পারেননি তার বাবা-মা। শৈশব কাটতে না কাটতেই মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ের মালা গলায় পরতে হয় এলিজাকে। বিয়ে হয় টাঙ্গাইলের করটিয়া ইউনিয়নের নগর জলফৈ গ্রামের নাদের আলীর বড় ছেলে মোঃ আবু সাইদের সঙ্গে। আবু সাইদ ছিলেন রিকশাচালক।এলিজা জানান
, বিয়ের কয়েক বছরের মাথায়ই এলিজার কোলজুড়ে আসে তিন তিনটি সন্তান। দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। আবু সাইদ রিকশা চালিয়ে মাসে আয় করতে পারেন বড় জোর ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। এ সামান্য আয়ে ৫ সদস্যের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। অভাব যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে কারণে-অকারণে ঝগড়া লাগাটা প্রতিদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে ক্ষুধার তাড়না, অন্যদিকে অশান্তির বিষবাষ্প, সব মিলিয়ে এক দুঃসহ জীবন। টাঙ্গাইল সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নগর জলফৈ গ্রামে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম রয়েছে। এলিজা এ কার্যক্রমের আওতায় দলীয় সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত হন। সেখানে সঞ্চয় জমা করেন আবার প্রয়োজনে ঋণ তোলেন। কিন্তু ঋণের টাকা কোনো উৎপাদনমূলক কাজে না খরচ করে সংসারে ব্যয় করে ফেলেন। এতে ক্রমান্বয়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। একদিন দলের সভা শেষে টাঙ্গাইল সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মীর কাছে জানতে পারেন গ্রাউরি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা নারীদের ‘নারী-পুরুষ সম্পর্ক : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি’ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সব কিছু জেনে এলিজা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য তালিকাভুক্ত হন। তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে এলিজা জানতে পারেন, নারীর বঞ্চনার কথা, নারীর পরনির্ভর জীবনের গ্লানির কথা। উপলব্ধি করেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের গুরুত্ব, যা তাকে প্রেরণা জোগায় উৎপাদনমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে। এ সময় এলিজা সিদ্ধান্ত নেন, ঋণ নিয়ে ব্যবসা করবেন। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে টাঙ্গাইল সমাজ উন্নয়ন সংস্থা থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আর নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে শুরু করেন ক্ষুদ্র ব্যবসা। আত্মবিশ্বাস আর বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে চালাতে থাকেন তার নিজস্ব মুদি দোকান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু সামনের দিকে এগিয়ে চলা। সুখের হাওয়া বইতে থাকে এলিজার সংসারে। পরিবারে খাবারের মান পরিবর্তন হয়, ছেলেমেয়ের ছোট ছোট চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারেন। বাড়িতে নতুন করে ঘর তুলেছেন এলিজা। অভাবের তাড়না না থাকায় স্বামী-স্ত্রীতেও ঝগড়া হয় না তেমন একটা। এসব ভেবে এলিজার মন আনন্দে ভরে ওঠে। এলিজার বর্তমান পুঁজি ৭৫ হাজার টাকা। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার মতো লাভ থাকে। এলিজার স্বামীও তাকে উৎসাহ দেন এবং সহযোগিতা করেন। এলিজার স্বপ্ন, তিনি আরও বড়, আরও সফল ব্যবসায়ী হবেন। এলিজা বলেন, ‘আমি এহন খুবই সুখী। আমার স্বামী আমারে খুব ভালোবাসে, মর্যাদা দেয়। আমার পরিবারের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমার স্বামী আমার মতামতের গুরুত্ব দেয়। প্রত্যেকটা নারীরই উচিত, আমার মতো আয়মূলক কাজ করা। তাতে যেমন পরিবারের অভাব দূর হব, আবার পরিবারে ও সমাজে তার মর্যাদাও বাড়ব’।


0 comments:

Post a Comment